বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইতিহাসে 'ক্ষুদ্রঋণ' বা মাইক্রোক্রেডিট একটি অতি পরিচিত ও প্রশংসিত নাম। প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থা যখন জামানত ছাড়া প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষদের ঋণ দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংকের উদ্ভাবিত ক্ষুদ্রঋণ ধারণা গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিশাল বিপ্লব আনে। ২০০৬ সালে ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করে।
ক্ষুদ্রঋণের মূল লক্ষ্য ছিল জামানত ছাড়াই সমাজের চরম দরিদ্র মানুষ, বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের ছোট ছোট অংকের ঋণ দেওয়া। যাতে তারা হাঁস-মুরগি পালন, গবাদিপশু পালন, হস্তশিল্প বা ছোট দোকান দিয়ে স্বাবলম্বী হতে পারেন। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো ঋণগ্রহীতাদের দলগত জবাবদিহিতা, যার ফলে ঋণ পরিশোধের হার ছিল প্রায় ৯৭-৯৮ শতাংশ।
ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার ফলে কোটি কোটি নারী নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছেন। এর মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন, শিশুদের শিক্ষা প্রদান এবং স্বাস্থ্যের উন্নয়ন নিশ্চিত হয়েছে। ব্র্যাক (BRAC), আশা (ASA), টিএমএসএস (TMSS)-এর মতো এনজিওগুলো সারাদেশে ক্ষুদ্রঋণ ছড়িয়ে দিয়ে দারিদ্র্য বিমোচনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে।
তবে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে কিছু সমালোচনাও রয়েছে। প্রধান সমালোচনা হলো এই ঋণের সুদের হার প্রথাগত ব্যাংকের চেয়ে কিছুটা বেশি। সময়মতো কিস্তি পরিশোধের চাপে অনেক সময় দরিদ্র পরিবারগুলো পুনরায় অন্য জায়গা থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হয়, যাকে 'ঋণের চক্র' বলা হয়।
এই সমস্যাগুলো সমাধান করতে ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার (MRA) তদারকি জোরদার করা হয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্রঋণকে কেবল জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম না বানিয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা (Micro-enterprise) তৈরির দিকে মোড় ঘোরানো হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও গতিশীল করছে।